
কে এই শুভাংশু শুক্লা? জানুন ভারতের নতুন মহাকাশ বীরের সম্পূর্ণ কাহিনী
গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা হলেন একজন ভারতীয় বায়ুসেনার টেস্ট পাইলট, প্রকৌশলী এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO)-এর একজন নির্বাচিত মহাকাশচারী. রাকেশ শর্মার ৪১ বছর পর, তিনিই দ্বিতীয় ভারতীয় যিনি মহাকাশে যাত্রা করেছেন. ২০২৫ সালের জুন মাসে তিনি Axiom Mission 4 (Ax-4)-এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) যান এবং তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ISS পরিদর্শন করেছেন.
প্রাথমিক জীবন ও কর্মজীবন:
জন্ম ও পরিবার: শুভাংশু শুক্লার জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের লখনউতে. তিনি তাঁর পরিবারের প্রথম ব্যক্তি যিনি সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন. তাঁর স্ত্রী কামনা শুক্লা একজন দন্তচিকিৎসক.
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ:
তিনি ২০০৫ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (NDA) থেকে স্নাতক হন এবং ২০০৬ সালে ভারতীয় বায়ুসেনায় যোগ দেন. ২০১৯ সালে তিনি মহাকাশচারী প্রোগ্রামের জন্য নির্বাচিত হন এবং রাশিয়ার গ্যাগারিন কসমোনট ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ নেন.
বায়ুসেনায় অভিজ্ঞতা: গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুক্লার AN-32, জাগুয়ার, হক, মিগ-২১, মিগ-২৯ এবং Su-30MKI-এর মতো বিভিন্ন যুদ্ধবিমান চালানোর ২০০০ ঘণ্টারও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে.
মহাকাশ অভিযান:
শুভাংশু শুক্লা ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানব মহাকাশযান কর্মসূচি গগনযান-এর জন্য নির্বাচিত চারজন মহাকাশচারীর মধ্যে একজন. গগনযান মিশনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, NASA এবং ISRO-এর যৌথ উদ্যোগে তাঁকে Axiom Mission 4-এর জন্য পাইলট হিসেবে নির্বাচন করা হয়.
এই মিশনের অংশ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রায় ১৮ দিন কাটিয়েছেন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, যা ভারতের ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ. এই ঐতিহাসিক যাত্রার মাধ্যমে তিনি একবিংশ শতাব্দীতে মহাকাশ ভ্রমণকারী প্রথম ভারতীয় হয়েছেন. মহাকাশে থাকাকালীন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন. মিশন শেষে তিনি নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন.
মহাকাশে শুভাংশু শুক্লার কাজ ও গবেষণা:
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকাকালীন শুভাংশু শুক্লার মূল দায়িত্ব ছিল একজন মিশন পাইলট হিসেবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা। তাঁর কাজগুলো মূলত ভারতের ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযান, বিশেষ করে ‘গগনযান’ মিশনকে সামনে রেখে ডিজাইন করা হয়েছিল।
তিনি যেসকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
বৈজ্ঞানিক গবেষণা: তিনি মহাকাশে প্রায় ৬০টিরও বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করেন, যার মধ্যে ৭টি ছিল সরাসরি ISRO দ্বারা নির্ধারিত। তাঁর গবেষণার প্রধান বিষয়গুলির মধ্যে ছিল:
খাদ্য ও পুষ্টি: মহাকাশে ভোজ্য শৈবাল (edible algae) এবং অন্যান্য শস্যের (যেমন মেথি এবং মুগ) বৃদ্ধি ও পুষ্টিগুণ পরীক্ষা করা।
মানবদেহ সংক্রান্ত গবেষণা: মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে মানুষের পেশী পুনরুজ্জীবন (muscle regeneration) এবং জ্ঞানীয় কর্মক্ষমতা (cognitive performance) পর্যবেক্ষণ করা।
অণুজীববিদ্যা: মহাকাশের পরিবেশে অণুজীবের (microbial) বৃদ্ধি এবং টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করা।
বিকিরণ পর্যবেক্ষণ: মহাকাশচারী হিসেবে তাঁর শরীরে মহাজাগতিক বিকিরণের (cosmic radiation) প্রভাব নিরীক্ষণের জন্য ডসিমিটার ব্যবহার করা।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: তিনি Axiom-4 এবং এক্সপিডিশন ৭৩-এর অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রু সদস্যদের সাথে মিলেমিশে কাজ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক মহাকাশ সহযোগিতায় ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা তুলে ধরে।
জনসংযোগ: মহাকাশে থাকাকালীন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে একটি লাইভ ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন।
তাঁর মিশনটি মূলত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ভেতরে বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপর केंद्रित ছিল। তিনি মহাকাশযানের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্ন পরীক্ষা পরিচালনা করেছেন। তাঁর কার্যক্রমের মধ্যে কোনো স্পেসওয়াক (মহাকাশযানের বাইরে হাঁটা) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পৃথিবীতে ফেরার পর, মহাকর্ষের সাথে মানিয়ে নিতে তাঁকে শারীরিক অনুশীলনের মাধ্যমে পুনরায় হাঁটতে শিখতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) কী?
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা ISS হলো পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে প্রদক্ষিণকারী একটি ভাসমান গবেষণাগার। এটি কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়, বরং আমেরিকা (NASA), রাশিয়া (Roscosmos), ইউরোপ (ESA), জাপান (JAXA) এবং কানাডার (CSA) মতো একাধিক দেশের মহাকাশ সংস্থার একটি যৌথ প্রকল্প। এখানে বিভিন্ন দেশের মহাকাশচারীরা মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালান, যা ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের পথ প্রশস্ত করে।
